জাহাঙ্গীর আলম : মুসলিম উম্মাহর দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণ মুক্তি কামনা ও বিশ্ব শান্তির জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে সাহায্যে চেয়ে শেষ হলো প্রথম পর্বের তিনদিনের তাবলীগ জামাতের বৃহত্তম সমাবেশ বিশ্ব ইজতেমা। এই প্রথম পর্বের ইজতেমায় মোনাজাত পরিচালনা করেন বাংলাদেশের তাবলীগ জামাতের শীর্ষ মুরুব্বী হাফেজ মাওলানা জুবায়ের। টঙ্গী তুরাগ তীরের এই জমায়েতে লাখ লাখ মুসল্লি উপস্থিত হয়ে মোনাজাতে অংশ নেন। মোনাজাত চলাকালে সমগ্র ইজতেমা ময়দান ও আশেপাশের এলাকায় পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। মোনাজাতে আত্মশুদ্ধি ও নিজ নিজ গুণাহ মাফের পাশাপাশি দুনিয়ার সব বালা-মুসিবত থেকে হেফাজত করতে আল্লাহর দরবারে রহমত প্রার্থনা করেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। মোনাজাত চলাকালীন সময় আমিন আমিন শব্দে পুরো ইজতেমা ময়দান বিরাজ করছে অন্যরকম ধর্মীয় আমেজ। ধনী-গরিব,নেতা- কর্মী নির্বিশেষের সকল শ্রেণী-পেশা- গুষ্টির মানুষ আল্লাহর দরবারে দু’হাত তুলে নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন। লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান সকলেই মহান আল্লাহর দরবারে নিজকে সমর্পণ করে নিজ নিজ গুণা মাপের জন্য আখেরি মোনাজাতে শরিক হন। মোনাজাতে মাওলানা জুবায়ের আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে দিনের উপর সবাই যেন চলতে পারে সে দোয়া করেন । এছাড়া দুনিয়ার সব বালা মুসিবত থেকে মানুষকে হেফাজত করতে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। তার সঙ্গে দু’হাত তুলে আমিন আল্লাহুম্মা আমিন ধ্বনি তুলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন উপস্থিত মুসল্লিরা। মোনাজাতে মাওলানা জুবায়ের বলেন, আমাদের মধ্যে হানাহানি মারামারি বন্ধ করে দেন। আমরা সবায় ভাই ভাই হয়ে চলতে চাই। কেউ যেন কারো উপর বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা না বলি। আমাদের উপর আল্লাহর রহমত নাযিল করুক। দোয়ায়ে তিনি আরো বলেন, হে আল্লাহ, যারা রোগে আক্রান্ত সেবা দান করেন। হে আল্লাহ, বিশ্ব ইজতেমাকে কবুল করেন। হে আল্লাহ, আমাদের দোয়া কবুল করেন। ইত্যাদি গভীর আকুতি- মিনতি ভাষায় মোনাজাত করা হয়। আবেগঘন আখেরি মোনাজাতে পরিচালনা করতে গিয়ে মাওলানা মোঃ জুবায়ের কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এ সময় উপস্থিত লাখ লাখ মুসল্লিদের মধ্যে কান্নার রোল পরে যায়। কান্নার শব্দ পুরো ইজতেমা এলাকার বাতাস বাড়িয়ে হয়ে ওঠে। এর আগে ভোর থেকে শুরু হয় দিক নির্দেশনামূলক বয়ান। শীর্ষস্থানীয় অনেক আলেম ইসলামের পথে সঠিকভাবে চলার জন্য মুসল্লিরদের উদ্দেশ্যে হেদায়েতি বয়ান দেন। মোনাজাতের আগে বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ইব্রাহিম দেওলা। বয়ান শেষে সকাল ৯ টায় ১১ মিনিটে শুরু হয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আখেরি মোনাজাত। শেষ হয় ৯টা ৩৫মিনটে মনোজাত শুরুর সঙ্গে সঙ্গে জনসমুদ্রে হঠাৎ নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। যে যেখানে ছিলেন সেখানে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে হাত তোলেন আল্লাহর দরবারে। কান্নায় বুক ভাসান মুসল্লির। প্রায় ২৪ মিনিটের মোনাজাতে আরবি ভাষায় ‘রাব্বানা যলামনা আনফুসানা’ দিয়ে শুরু করা হয়। মাওলানা জুবায়ের প্রথম ৬মিনিট পবিত্র কোরআনে বর্ণিত দোয়ায় আয়াতগুলো উচ্চারণ করেন। শেষের দিকে ১৯ মিনিট দোয়া করেন আরবি ও বাংলা ভাষায়। মুঠোফোন ও স্যাটেলাইট টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের সুবাদে দেশ-বিদেশের লাখো মানুষ একসঙ্গে হাত তোলে দোয়ায় শরিক হন। তাবলীগ জামাতের আয়োজনে মুসলমানদের অন্যতম এই বৃহৎ সমাবেশের আখেরি মোনাজাত অংশ নিতে শনিবার রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইজতেমার ময়দানে আসতে শুরু করেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লীরা। রবিবার শীত কম থাকায় রাজধানীর আশেপাশে এলাকায় লোকজনও আসতে থাকেন ইজতেমার ময়দানের দিকে। মোনাজাতে অংশ নিতে গত শনিবার থেকে মুসল্লিরা চারদিক থেকে ইজতেমার ময়দানের দিকে স্রোতের মতো আসতে থাকে। এ সময় টঙ্গী হয়ে উঠে সকল পথের মোহনা। প্রথম পর্বের মোনাজাত সকাল ৯টা ১১মিনিট শুরু হওয়ার কারণে ৯টার আগেই ইজতেমার ময়দানসহ আশেপাশে এলাকার সড়ক মহাসড়ক অলিগলি ও খালি জায়গায় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় পুরো ইজতেমা এলাকা। এসময় মহিলাদের ও উপচে পড়া ভীড় দেখা গেছে। ইজতেমাস্থলে পৌঁছাতে না পেরে অনেক মুসল্লী আখেরি মোনাজাতের জন্য খবরের কাগজ পার্টি, বস্তায় ও পলিথিন বিছিয়ে কামারপাড়া সড়ক ও ঢাকা ময়মনসিং মহাসড়ক এবং অলিগলিসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। নানা নানান বয়সে বিভিন্ন পেশার মানুষের পাশাপাশি নারীদেরও মোনাজাতে অংশ নিতে দেখা যায়। এমনকি বাসা বাড়িও কারখানার ছাদ, নৌকা বাসের ছাদ, সহ যে যেখানে পেরেছেন সেখানেই বসে দুই হাত তুলে মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন। আয়োজকরা জানায়, প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাত প্রায় ২০ লক্ষাধিক মুসল্লি অংশ নেন। পাশাপাশি বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রায় ৩ হাজার মেহমান ও ইজতেমায় প্রথম পর্বে অংশ নেন। মোনাজাতে অংশগ্রহণের সুবিধার্থে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ইজতেমার চারপাশে মহাসড়কসহ আশেপাশে প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত শাখা সড়কগুলোতে মাইকের ব্যবস্থা করা হয়। ফিরতি যাত্রা বিড়ম্বনাঃ আখেরি মোনাজাত শেষ হওয়ার পর একসঙ্গে লাখ লাখ মানুষ ফিরতে শুরু করলে সর্বত্র মহাযটের সৃষ্টি হয়। টঙ্গী রেল স্টেশনে যাত্রীদের জন্য অপেক্ষমান টেন গুলোতে উঠতে মানুষের জীবনবাজির লড়াই ছিল উদ্বেগগ জনক। ট্রেনের ভিতরে জায়গা না পেয়ে সাছ ও দরজা জানালায় ঝুলে হাজার হাজার মানুষ তাদের গন্তব্যস্থলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফিরতে দেখা যায়। একপর্যায়ে মানুষের জন্য ট্রেন দেখা যাচ্ছিল না। সড়ক ও যান চলাচল বন্ধ থাকায় ফিরতি মুসল্লিদের বিড়ম্বনা ও কষ্টের সীমা ছিল না। তিন-চার দিন ধরে টঙ্গীতে জামায়েত হওয়া মুসল্লিরা মোনাজাতের পর এক যোগে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরতে চাইলে অবর্ণীয় দুর্ভোগের শিকার হন। হাজার হাজার বৃদ্ধ, শিশু- কিশোর ও মহিলা মাইলের পর মাইল হেঁটে মোনাজাতে শরিক হন এবং একইভাবে ফিরেন। পরে যানবাহন চলাচল শুরু হলে পরিস্থিতি আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে থাকে। মোবাইল নেটওয়ার্কঃ রোববার আখরি মোনাজাতের সময় ইজতেমা ময়দান ও টঙ্গী থেকে কোন মোবাইলে দেশের বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করতে নেটওয়ার্কের সমস্যা দেখা দিয়েছে। মাঝেমধ্যে লাইন পেলেও মুহূর্তে কেটে যাচ্ছিল। মোবাইল ফোন কোম্পানি গুলো নেটওয়ার্ক সুবিধা দিতে ইজতেমা উপলক্ষে ইজতেমার আশপাশ এলাকা অতিরিক্ত মোবাইল টাওয়ার সংযোগ করেও এর সমস্যার কোন সমাধান দিতে পারেনি। ইজতেমা আয়োজক কমিটির সন্তোষ প্রকাশঃ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মুসল্লিদের আসতে এবং ময়দানের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকা প্রশংসনীয় ছিল। আয়োজক কমিটি প্রশাসনের উদ্যোতন কর্মকর্তা ও অন্তবর্তী কালীন সরকারের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এছাড়াও এর ময়দানের আশেপাশে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটায় তারা সন্তুষ্ট।